একজন নয়ন বন্ড কি একদিনেই তৈরি হয়?

ফেসবুকে সাধারণ মানুষ ইদানিং নানা ঘটনায় সরব হন। প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। এসব ঘটনাকে বিভিন্নভাবে আখ্যা দেয়া হলেও প্রতিবাদে যে একেবারেই কাজ হয় না, তা নয়। বরগুনায় স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তেমনই একটি উদাহরণ।

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ নতুন করে সবার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। প্রতিবাদী করেছে। প্রতিবাদের একটাই কারণ, আর তা হলো খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

ওই ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পর খুনিদের ধরতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কঠোর ভূমিকায় ছিলেন হাইকোর্ট। এসব কারণে এই হত্যাকাণ্ড আলোচিত হয়ে উঠেছিল।

এর মধ্যেই গত ২ জুলাই ভোরে পুলিশ এক নতুন খবর জানালো। ওই দিন বরগুনা জেলা পুলিশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামী নয়ন বন্ড পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

শুরুর দিকে ওই মামলার অগ্রগতি জানতে চেয়েছিলেন হাইকোর্ট। তাই ক্রসফায়ারে নয়ন বন্ডের নিহতের কথা আদালতকে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলেছেন হাইকোর্ট।

এই ইস্যুতে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পছন্দ করি না। এতে পাবলিকের কাছে ভুল তথ্য যেতে পারে।’

উচ্চ আদালতের এই অবস্থানের সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করছি। কারণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে দেশে আর বিচারব্যস্থা বলতে কিছু থাকে না। নিরাপরাধ অনেক মানুষও ব্যক্তিস্বার্থ বা কারও প্রতিহিংসার কবলে পড়ে তখন এই কথিত বন্দুকযুদ্ধের শিকার হন। এর ভয়ঙ্কর উদাহরণ আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি।

এ কারণেই বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ বলতেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করে আসছেন। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সাময়িক সমর্থন এনে দিতে পারে। তবে কোনোভাবেই অপরাধ দমনে এটা স্থায়ী সমাধান নয়। এক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অনেকাংশে দায়ী। এছাড়া এমন অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাময়িক সমর্থন বাড়াতে সহায়তা করে বলে আমরা মনে করি।

বরগুনার ঘটনায় আদালত আরও বলেছেন: ‘একদিনেই এই নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। তাকে লালন করা হয়েছে। ক্রিমিনাল বানানো হয়েছে।’ আদালতের এই বক্তব্য যথার্থ।

রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর সোশ্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন এসেছে। নয়নের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে প্রভাবশালীদের নাম এসেছে। এছাড়া নয়ন বন্ডের সহযোগী হিসেবে যারা রিফাতকে কুপিয়েছিল, তাদের কয়েকজনও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক নেতার ঘনিষ্ঠ বলেই জানা গেছে।

এটা স্বীকার করতে হবে যে, নয়ন বন্ডের অপরাধের মাত্রা একদিনে এই পর্যায়ে আসেনি। এর আগেও নয়নের অপরাধ প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তখন তাকে দমাতে তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বিভিন্ন ঘটনায় দেশের নানা স্থানে প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে এমন আরও অনেক নয়ন বন্ড এখনও রাজপথ থেকে শুরু করে অলি-গলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের লাগাম টানতে সংশ্লিষ্টদের আরও কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে নতুন করে কোনো নয়ন বন্ড তৈরির পথ যেমন সুগম হবে, তেমনই অকালে ঝরে যাবে আরও বহু রিফাত।